জ্ঞানদানন্দিনী ঠাকুর: শাড়ি পরার আধুনিক ধারা ও যশোরের গর্ব!
আজ আমরা জানবো এক অসাধারণ নারীর গল্প, যিনি কেবল আমাদের শাড়ি পরার ধারা বদলাননি, বরং সমাজের গভীরে পরিবর্তনের বীজ বপন করেছিলেন। তার নাম জ্ঞানদানন্দিনী ঠাকুর। কিন্তু জানেন কি, এই অনন্য নারী আমাদের যশোরের মেয়ে? আজকের এই গল্প আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
১৮৫০ সালে যশোরের নরেন্দ্রপুর গ্রামে জন্ম নেন জ্ঞানদানন্দিনী। তার বাবা ছিলেন অভয়চরণ মুখোপাধ্যায় এবং মা নিস্তারিনী দেবী। মাত্র সাত বছর বয়সে, ১৮৫৭ সালে, তিনি বিয়ে করেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, যিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজো ভাই এবং ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগদানকারী প্রথম ভারতীয়।
বিয়ের পর, যশোরের শান্ত পরিবেশ ছেড়ে জ্ঞানদানন্দিনী পাড়ি দেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের ব্যস্ত আর বনেদি জীবনযাত্রায়। তবে তিনি নতুন পরিবেশে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছিলেন। দেবর হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে তিনি লেখাপড়া শেখেন এবং সমাজে নিজের স্থান তৈরি করতে শুরু করেন।
১৮৬২ সালে, যখন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ট্রেনিংয়ের জন্য ইংল্যান্ড যান, তখন জ্ঞানদানন্দিনী স্বামীর সাথে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শ্বশুর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এরপরেও তিনি থেমে থাকেননি। স্বামীর চাকরির সুবাদে বোম্বেতে গিয়ে তিনি ইউরোপীয়দের জীবনযাত্রা আর পোশাকের কৌশল শেখেন। এখান থেকেই তিনি শাড়ি পরার প্রচলিত ধরন বদলানোর চিন্তা শুরু করেন।
সেসময় ভারতীয় নারীরা পেটিকোট ছাড়া শাড়ি পরতেন, যা আধুনিকতার সঙ্গে ছিল খুবই বেমানান। জ্ঞানদানন্দিনী শাড়ির সঙ্গে পেটিকোট আর ব্লাউজ ব্যবহার শুরু করেন এবং শাড়ি পরার একটি নতুন স্টাইল তৈরি করেন। আজ যেভাবে আমাদের নারীরা শাড়ি পরেন, সেটার প্রচলন করেছিলেন তিনিই।
শুধু তা-ই নয়, তিনি পারসি নারীদের কাছ থেকে শাড়ি পরার ধরন শিখে সেটাকে নিজের মতো করে রূপান্তর করেন। প্রথমবারের মতো শাড়ির আঁচল বাম কাঁধে ফেলার স্টাইল চালু করেন তিনি, যা এখন ব্রাহ্মিকা শাড়ি নামে পরিচিত। এমনকি তিনি নারীদের এই স্টাইল শেখাতে ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেন।
১৮৬৬ সালে ভাইসরয় লর্ড লরেন্সের ভোজসভায় স্বামীর সাথে যোগ দিয়ে তিনি সমাজের রীতি ভেঙে নারীদের সাহসিকতার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এর ফলে ঠাকুর পরিবারে মতভেদ সৃষ্টি হলেও, তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
জ্ঞানদানন্দিনী শুধু পোশাকের ক্ষেত্রে নয়, পারিবারিক কাঠামোতেও পরিবর্তন এনেছিলেন। তিনি যৌথ পরিবার থেকে বের হয়ে একক পরিবারের ধারণা তৈরি করেন। ১৮৬৮ সালে তিনি পার্ক স্ট্রিটে আলাদা বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। তবে ঠাকুর পরিবারের ছোট সদস্যদের, বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি তার ছিল গভীর স্নেহ।
তিনি ছিলেন একজন সাহসী ও স্বাধীনচেতা নারী। এমনকি তিনি তার মেয়ে ইন্দিরাকে মুসলিম হাউজ টিউটরের কাছে পড়তে দিয়ে সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তার স্বাধীনচিন্তা ও নতুনত্বের কারণে তিনি ঠাকুর পরিবারে একজন অনন্য স্থানে ছিলেন।
১৮৭৭ সালে, গর্ভবতী অবস্থায়, তিনি স্বামীর অনুপস্থিতিতেই ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান, যা তখনকার সমাজের জন্য ছিল অকল্পনীয়। তার সাহস ও উদ্ভাবনী চিন্তা ভারতের নারীদের জন্য নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।
সরলা দেবী চৌধুরানীর ‘জীবনের ঝরাপাতা’ থেকে জানা যায়, তিনি প্রথম জন্মদিন উদযাপনের ধারণা নিয়ে আসেন, যা তখন বাঙালি সমাজে ছিল সম্পূর্ণ নতুন। তার এই ছোট উদ্যোগ থেকেই জন্মদিন উদযাপন আজ আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
জ্ঞানদানন্দিনী ঠাকুর শুধু আমাদের যশোরের গর্ব নন, তিনি বাঙালি নারী জাগরণের প্রতীক। তার অবদান বাঙালির সংস্কৃতি, পোশাক, ও সমাজে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আমরা তার প্রতি চিরঋণী।
আপনারা কি মনে করেন, এমন একজন বিপ্লবী নারীকে আমাদের আরও বেশি সম্মান জানানো উচিত? কমেন্টে আপনার মতামত জানান।
No comments