সমুদ্রের শয়তান থেকে ‘ডুম্সডে’ মাছ! সমুদ্রের অন্ধকার জগতের ভয়ঙ্কর বাসিন্দা – ‘ব্ল্যাক সি ডেভিল’
সমুদ্রের শয়তান থেকে ‘ডুম্সডে’ মাছ! কেন বারবার গভীর সমুদ্র থেকে উঠে আসছে রহস্যময় প্রাণীরা?
সমুদ্রের অতলে এমন কিছু প্রাণী বাস করে, যাদের চেহারা যেমন ভয়ঙ্কর, তেমনই রহস্যময়। এদের দেখা পাওয়া দুষ্কর, কারণ সূর্যের আলো যেখানে পৌঁছায় না, সেই অন্ধকার জগৎই এদের আবাস। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গভীর সমুদ্রের প্রাণী ভেসে উঠছে সমুদ্রপৃষ্ঠে, যা বিজ্ঞানীদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। কেন এমনটা ঘটছে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ উঠে এসেছে গবেষণায়।
সমুদ্রের অন্ধকার জগতের ভয়ঙ্কর বাসিন্দা – ‘ব্ল্যাক সি ডেভিল’
হাম্পব্যাক অ্যাংলারফিশ, যার আরেক নাম ‘ব্ল্যাক সি ডেভিল’, তার অদ্ভুত চেহারার জন্য বিখ্যাত। রাক্ষুসে এই মাছের মাথা বড় হলেও দেহ ছোট, এবং মাথার ওপর শুঁড়ের মতো একটি অংশ থাকে যা শিকারকে আকর্ষণ করতে সাহায্য করে। এই মাছ সাধারণত ৫০০ থেকে ৪৫০০ মিটার গভীরে, অর্থাৎ প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকার অঞ্চলে বসবাস করে।
২০১৪ সালে প্রথমবার এই মাছের ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছিল হাওয়াই উপকূলে। এরপর ২০২৫ সালে স্পেনের টেনেরিফ দ্বীপের কাছে আবারও দেখা মিলেছে এই রহস্যময় মাছটির। এত বছর পর আবারও দেখা পাওয়াটা নিঃসন্দেহে বিজ্ঞানীদের অবাক করেছে।
‘ডুম্সডে ফিশ’ – সমুদ্রের গোপন বার্তাবাহক?
অরফিশ, যাকে ‘ডুম্সডে ফিশ’ বা ‘সমুদ্র সাপ’ বলা হয়, সেটিও সম্প্রতি মেক্সিকোর এক সৈকতে দেখা গেছে। সাধারণত এই মাছ ১০০০-৪০০০ ফুট গভীরে থাকে, তাই সমুদ্রপৃষ্ঠে উঠে আসাটা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। অদ্ভুতভাবে, জাপানের লোককথায় অরফিশকে ‘সমুদ্রের ঈশ্বরের বার্তাবাহক’ বলা হয়, এবং বিশ্বাস করা হয় যে, কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগে এরা উঠে আসে।
২০১১ সালে জাপানের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের আগে প্রায় ২০টি অরফিশ জাপানের উপকূলে ভেসে উঠেছিল। একইভাবে, ২০১৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্রসৈকতে ৫.৫ মিটার লম্বা একটি অরফিশ পাওয়া গিয়েছিল, যা বিজ্ঞানীদের অবাক করেছিল। ২০১৭ সালে ফিলিপিন্সেও এমন ঘটনা ঘটেছিল।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভূমিকম্পের কারণে সমুদ্রের গভীর স্তরে চাপে পরিবর্তন হলে, বা প্রচুর পরিমাণে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস নিঃসৃত হলে, গভীর সমুদ্রে থাকা প্রাণীগুলো বাধ্য হয়ে উপরে উঠে আসে।
প্রাগৈতিহাসিক হাঙর থেকে দৈত্যাকার জেলিফিশ – কে আসছে উপরে?
১. গবলিন হাঙর: এই হাঙরটিকে ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ বলা হয়। ২০১৪ সালে ফ্লোরিডার এক ডকের কাছে এটি দেখা যায়, যা গবেষকদের অবাক করেছিল। লম্বা মুখ, ধারালো দাঁত, আর প্রসারিত চোয়াল এই হাঙরকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছে।
-
স্টিজিওমেডুসা গিগান্টিয়া: এটি এক বিশাল জেলিফিশ, যা সাধারণত ১০০০ থেকে ৪০০০ মিটার গভীরে থাকে। ২০২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেরি বে উপকূলে এটি দেখা গিয়েছিল, যার লম্বা বাহুগুলি ১০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
-
ফ্রিল্ড হাঙর: দেখতে ইলের মতো হলেও এর মাথাটি হাঙরের মতো। ২০০৭ সালে জাপানের এক মৎস্যজীবী অসুস্থ অবস্থায় একটি ফ্রিল্ড হাঙর ধরেন, যা পরে মারা যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সমুদ্রের গভীর স্তরে কোনো পরিবর্তনের কারণেই এটি উপরে উঠে এসেছিল।
গভীর সমুদ্রের প্রাণীগুলি কেন উপরে উঠে আসছে?
এই রহস্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন—
- ভূমিকম্প এবং ভৌগোলিক পরিবর্তন: গভীর সমুদ্রের চাপে হঠাৎ পরিবর্তন হলে প্রাণীগুলি উপরে উঠে আসতে পারে।
- গ্লোবাল ওয়ার্মিং: সমুদ্রের তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে অনেক প্রাণী বাধ্য হয়ে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ত্যাগ করছে।
- মানবসৃষ্ট কারণ: গভীর সমুদ্রে খনন, সাবমেরিন কার্যক্রম এবং সমুদ্রের দূষণও এই প্রাণীদের চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে।
গভীর সমুদ্রের রহস্যময় প্রাণীগুলোর আচরণ আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কোনো বার্তা দিচ্ছে কি না, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণা চলছে, আর আমরা হয়তো শিগগিরই জানতে পারব, সমুদ্রের এই ভয়ঙ্কর প্রাণীরা কেন বারবার অজানা বার্তা নিয়ে উঠে আসছে আমাদের সামনে।
.jpg)
.jpg)


No comments