ইলেকট্রিক চেয়ারের ইতিহাস ও উদ্ভাবন

 

ইলেকট্রিক চেয়ার (Electric Chair) একসময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অন্যতম প্রধান পদ্ধতি ছিল, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে উচ্চ-ভোল্টেজের বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়। তবে এটি মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।



১. ইলেকট্রিক চেয়ারের ইতিহাস ও উদ্ভাবন

  • ১৮৮১ সালে নিউ ইয়র্কের ডেন্টিস্ট আলফ্রেড সাউথউইক (Alfred P. Southwick) প্রথম ধারণা দেন যে বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যেতে পারে।
  • ১৮৮৮ সালে নিউ ইয়র্ক সরকার প্রথমবারের মতো ইলেকট্রিক চেয়ারকে মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি হিসেবে অনুমোদন দেয়।
  • ১৮৯০ সালে উইলিয়াম কেমেলার (William Kemmler) নামের এক অপরাধীর উপর এটি প্রথমবার প্রয়োগ করা হয়।

২. ইলেকট্রিক চেয়ারের গঠন ও উপাদান

(ক) কাঠামো ও চেয়ারের নির্মাণ

  • সাধারণত ওক বা ম্যাপল কাঠ দিয়ে চেয়ারটি তৈরি করা হয়, কারণ এটি মজবুত এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়।
  • চেয়ারের কাঠামোতে ধাতব ফ্রেম ও স্ক্রু ব্যবহার করা হয় যাতে এটি শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
  • চেয়ারের পেছনের দিকে উঁচু ব্যাকরেস্ট রাখা হয় যাতে বন্দী বসার পর ঠিকভাবে ফিট হয়।

(খ) ইলেকট্রিক্যাল কম্পোনেন্ট

  1. ইলেকট্রোড ও সংযোগ ব্যবস্থা:

    • মাথার জন্য একটি তামার ইলেকট্রোড এবং
    • একটি বা দুটি ইলেকট্রোড পায়ের জন্য সংযুক্ত করা হয়।
    • বিদ্যুৎ সঞ্চালন বাড়ানোর জন্য মাথায় ভেজা স্পঞ্জ দেওয়া হয়, যাতে ত্বকে বার্ন না হয় এবং শক দ্রুত কাজ করে।
  2. বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ট্রান্সফরমার:

    • সাধারণত ২০০০ থেকে ২৫০০ ভোল্ট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
    • ট্রান্সফরমার ব্যবহার করে ভোল্টেজ বাড়ানো বা কমানো হয়।
  3. চামড়ার স্ট্র্যাপ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা:

    • হাত, পা এবং বুকের চারপাশে চামড়ার স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
    • মুখের উপর একটি চামড়ার মুখোশ দেওয়া হয় যাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় মুখের বিকৃতি না দেখা যায়।



৩. মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ধাপ

(ক) বন্দীকে চেয়ারে বসানো ও প্রস্তুতি

  1. বন্দীকে চেয়ারে বসিয়ে হাত, পা ও বুকের চারপাশে চামড়ার বেল্ট দিয়ে আটকে দেওয়া হয়।
  2. মাথায় এবং পায়ে ইলেকট্রোড স্থাপন করা হয়।
  3. মাথার উপর ভেজা স্পঞ্জ দেওয়া হয়, যা বিদ্যুতের সঞ্চালন বাড়ায় এবং অতিরিক্ত বার্ন প্রতিরোধ করে।
  4. বিদ্যুৎ সংযোগের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।

(খ) ইলেকট্রিক শক প্রক্রিয়া

  1. প্রথম শক:

    • সাধারণত ২০০০-২৫০০ ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রায় ১৫-৩০ সেকেন্ড ধরে দেওয়া হয়।
    • এই শকে শরীরের প্রধান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক) প্রায় সাথে সাথেই কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
  2. দ্বিতীয় শক:

    • যদি প্রথম শকে মৃত্যু নিশ্চিত না হয়, তবে ১০০০-১৫০০ ভোল্টের দ্বিতীয় শক দেওয়া হয়।
    • এতে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ পুড়ে যায় এবং সম্পূর্ণ মৃত্যু ঘটে।
  3. চিকিৎসক বন্দীর মৃত্যু নিশ্চিত করেন।


৪. ইলেকট্রিক শকের শারীরিক প্রভাব

  • মস্তিষ্কে ভয়াবহ প্রভাব: শকের ফলে নিউরনগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে।
  • হৃদযন্ত্রের বিকলতা: প্রচণ্ড বিদ্যুৎ প্রবাহে হৃদপিণ্ড পুড়ে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়।
  • পেশির তীব্র সংকোচন: বিদ্যুৎ প্রবাহের কারণে পুরো শরীর শক্ত হয়ে যায়, অনেক সময় হাড় ভেঙে যায়।
  • ত্বকের বার্ন: উচ্চ ভোল্টেজের কারণে ত্বকে ফোসকা পড়ে বা পুড়ে যায়।
  • শরীর থেকে ধোঁয়া বের হওয়া: অতিরিক্ত তাপের কারণে শরীরের কিছু অংশ থেকে ধোঁয়া বের হয়।

৫. ইলেকট্রিক চেয়ারের বিতর্ক ও বিলুপ্তি

  • অনেক সময় বন্দীর মৃত্যু দীর্ঘায়িত হয় এবং এটি অমানবিক বলে সমালোচিত হয়েছে।
  • শক দেওয়ার সময় বন্দীর শরীর থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে, যা ভয়াবহ মনে হয়।
  • ২০০৮ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ রাজ্য এটি বাদ দিয়ে লিথাল ইনজেকশন (প্রাণঘাতী ইনজেকশন) ব্যবহার শুরু করেছে।

তবে কিছু রাজ্যে এখনো এটি বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে, বিশেষ করে ফ্লোরিডা, টেনেসি ও সাউথ ক্যারোলিনায়।


ইলেকট্রিক চেয়ার একসময় মৃত্যুদণ্ডের প্রধান পদ্ধতি ছিল, কিন্তু এটি ধীরে ধীরে অমানবিক বলে পরিগণিত হয়েছে। এটি মানবদেহের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় অনেক ভয়াবহ দৃশ্য সৃষ্টি করে। বর্তমানে অধিকাংশ দেশ এটি ত্যাগ করে বিষাক্ত ইনজেকশন, ফায়ারিং স্কোয়াড বা অন্য পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছে।


No comments

Theme images by Jason Morrow. Powered by Blogger.